Saturday, April 25, 2026
Homeস্বাস্থ্যকরোনাভাইরাসবাংলাদেশে ৪২ দিনে ‘পিকে’ উঠবে করোনা! ‘বিবিসি বিশ্লেষণ’

বাংলাদেশে ৪২ দিনে ‘পিকে’ উঠবে করোনা! ‘বিবিসি বিশ্লেষণ’

ডেস্ক রিপোর্ট:
 

দেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছিল গত ৮ মার্চ। আর সেই থেকে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ১০৪ দিনে শনাক্তের সংখ্যা সব মিলিয়ে এক লাখ ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে শনাক্তকৃত আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে ১০৯ দিনের মাথায়।

 
বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও করোনাভাইরাসে সংক্রমিতদের শনাক্ত করার হার এভাবেই ধীরগতিতে বাড়ছে। সে হিসাবে বাংলাদেশে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা চূড়ায় (পিক) যেতে আরো ৪২ দিন থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে আশঙ্কা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের। আবার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর পর চূড়ায় অবস্থানের স্থায়িত্ব একটা দীর্ঘ সময় ধরে হতে পারে বলেও তাঁরা আশঙ্কা করছেন।
 
আক্রান্তের হার যেভাবে বেড়েছে :
দেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর কয়েক দিন দৈনিক শনাক্তের সংখ্যা ছিল এক অঙ্কের ঘরে। তখন পরীক্ষা করত শুধু সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। পরে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শনাক্তের সংখ্যাও ক্রমে বাড়তে থাকে। এখন দেশের ৬১টি পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বেসরকারি কয়েকটি হাসপাতালকেও পরীক্ষার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রথম শনাক্ত হওয়ার প্রায় এক মাসের মাথায় ৯ এপ্রিল এক দিনে শতাধিক ব্যক্তি করোনাভাইরাস বহন করছে বলে শনাক্ত হয়। এরও প্রায় এক মাসের মাথায় গত ১১ মে এক দিনে শনাক্তের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যায়। এভাবে শনাক্তের মোট সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়ায় গত ২ জুন। অর্থাৎ বাকি ৫০ হাজার রোগী শনাক্ত হয়েছে শেষের ১৬ দিনে। সামনে দিনগুলোতে এই সংখ্যা আরো বাডতে থাকবে, আর এভাবে দেশে করোনাভাইরাস ক্রমেই সংক্রমণের চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
 
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন সাবেক পরিচালক বে-নজির আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘জুন মাসের প্রথম দিন থেকেই গ্রাফটা খুব খাড়াভাবে ওপরের দিকে উঠছে। এটা সামনের দিনগুলোতে আরো বাড়তে থাকবে।’
 
এরই মধ্যে করোনা শনাক্তের সংখ্যার দিক থেকে প্রথম ২০টি দেশের তালিকায় ঢুকে গেছে বাংলাদেশ। ইতালি বা ব্রাজিলের কয়েকটি শহরে যেভাবে সংক্রমণের বিস্ফোরণ দেখা গিয়েছিল, বাংলাদেশেও কোনো একটি জনপদে এমন সংক্রমণের বিস্ফোরণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন আরেকজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ অনেক ঘনবসতিপূর্ণ। এখানে স্বল্প আয়ের মানুষরা খুব গাদাগাদি করে থাকে। এমন পরিবেশে আক্রান্তের সংখ্যায় বিস্ফোরণ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়—ব্রাজিলের সাও পাওলো বা রিও ডি জেনিরোতে যেমনটা দেখা গেছে।’
 
দেশে পিক টাইম কবে আসবে :
ব্রিটেনে করোনা সংক্রমণের চূড়ান্ত পর্যায় বা পিক টাইম ৪২ দিন ধরে স্থায়ী ছিল। বাংলাদেশে এর চেয়েও বেশি সময় ধরে এই পিক টাইম স্থায়ী হতে পারে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বে-নজির আহমেদ।
 
ইউরোপের আরেক দেশ ইতালিতে পিক টাইমের স্থায়িত্ব ছিল আরো কম। সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা যেমন দ্রুতগতিতে বেড়েছে, তেমনি দ্রুতগতিতে সেটা সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে আবার বেশ দ্রুত নেমেও এসেছে। দেশটিতে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় ৩০ জানুয়ারি। মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যার গ্রাফ হু হু করে ওপরের দিকেই উঠতে থাকে। মার্চের শেষের দিকে শনাক্তের সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপর ধীরে ধীরে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা কমে আসতে থাকে। অর্থাৎ প্রথম কোনো করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়া থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে ধীরে ধীরে নেমে আসা, ইতালিতে এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে দুই মাসের মধ্যে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রথম শনাক্তের পর তিন মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখানে আক্রান্তের সংখ্যা এখনো ঊর্ধ্বমুখী। আক্রান্তের হার কবে নাগাদ সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাবে, সেটা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না।
 
‘লকডাউন’ শিথিলের পর থেকেই সংক্রমণ বেড়ে চলেছে :
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীন ও ইতালির দেখাদেখি বাংলাদেশ যদি শুরু থেকেই ‘লকডাউনে’ কড়াকড়ি আরোপের পাশাপাশি কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশন সঠিক ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসত, তাহলে এত দিনে বাংলাদেশ সংক্রমণের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে নিচে নেমে আসা শুরু করত। তবে এখনো যদি কঠোরভাবে জোনভিত্তিক ‘লকডাউন’ কার্যকর করা হয়, রোগী শনাক্ত করে তাদের যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয়, অর্থাৎ কমিউনিটি থেকে যদি সংক্রমণ কমিয়ে আনা যায়, তাহলে সংক্রমণের বিস্ফোরণ রোধ করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন ড. মুশতাক হোসেন। সে ক্ষেত্রে এক থেকে দেড় মাসের মধ্যেই চূড়ান্ত পর্যায় দেখা যেতে পারে বলে তিনি জানান।
 
একই মত ডা. বে-নজির আহমেদেরও। তিনিও জোর দিয়েছেন জোনভিত্তিক ‘লকডাউন’ কার্যকর করার ওপরে। তিনি বলছেন, ‘সরকার জোনভিত্তিক লকডাউন কার্যকরভাবে সম্পাদন না করলে, আর সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যবিধিগুলো মানতে দায়িত্বশীল না হলে, চূড়ান্ত পর্যায়ে আসতে আরো দেরি হবে।’
 
অন্যদিকে মুশতাক হোসেনের আশঙ্কা হলো, করোনা সংক্রমণের কার্ভ একবার নেমে যাওয়ার পর সেটা হয়তো আবারও ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। যেমনটা দেখা গিয়েছিল স্প্যানিশ ফ্লুর সময়টাতে।
 
গণহারে নমুনা পরীক্ষায় গুরুত্ব বিশেষজ্ঞদের:
ইউরোপে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর ওই সব দেশ থেকে যে যাত্রীরা বাংলাদেশ এসে বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিলেন তাঁদের মাধ্যমেই বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে বলে ধারণা করছেন বে-নজির আহমেদ।
 
এমডি/এমএইচ/বাংলাবার্তা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments